মসজিদে নববীর অন্যতম বরকতময় ও পবিত্র স্থান হলো ‘রিয়াদুল জান্নাহ’ বা বেহেশতের বাগান। বিশ্বের লাখো হাজি ও ওমরাহযাত্রী মসজিদে নববীতে গিয়ে এই স্থানে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করার জন্য ব্যাকুল থাকেন। আজকের এই ব্লগে আমরা জানব রিয়াদুল জান্নাহর ফজিলত এবং এর ভেতরের ঐতিহাসিক খুঁটি ও স্থানগুলোর পরিচিতি।
রিয়াদুল জান্নাহর পরিচয় ও ফজিলত
হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন:
‘আমার ঘর ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটি হল জান্নাতের বাগানের একটি বাগান, আর আমার মিম্বরটি হল আমার হাউযের উপর অবস্থিত।’ (বুখারী শরীফ)
রওজা মোবারক ও মিম্বার শরিফের মাঝখানের এই জায়গাটিই ‘রওজায়ে জান্নাত’ বা ‘রিয়াদুল জান্নাহ’ বা ‘বেহেস্তের বাগান’ নামে পরিচিত। এই স্থানটিতে ইবাদত করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এখানে নফল নামাজ, দোয়া, জিকির ও তওবা-ইস্তেগফারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রিয়াদুল জান্নাহর ঐতিহাসিক ও ফজিলতপূর্ণ খুঁটিসমূহ (উস্তওয়ানা)
রিয়াদুল জান্নাহর ভেতরে এবং এর আশপাশে বেশ কিছু ঐতিহাসিক খুঁটি রয়েছে, যেগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিগণের স্মৃতি:
- উস্তওয়ানা হান্নানা (খেজুর গাছের খুঁটি): রিয়াদুল জান্নাহতে রাসূল (সা.)-এর মিম্বারের ডান পাশে খেজুর গাছের স্থানে এই খুঁটিটি নির্মিত। রাসূল (সা.) এই খেজুর গাছের সাথে ভর দিয়ে খুতবা দিতেন। নতুন কাঠের মিম্বর তৈরি হলে পুরোনো মিম্বর স্থানান্তরের সময় এই শুকনো খেজুর গাছটি উচ্চস্বরে কেঁদেছিল।
- উস্তওয়ানা সারীর (বিছানার খুঁটি): এই খুঁটির স্থানে রাসূল (সা.) ইতিকাফ করতেন এবং রাতে আরামের জন্য তাঁর বিছানা এখানে স্থাপন করা হতো। এই খুঁটিটি রওজা শরিফের পশ্চিম পাশে জালি মোবারকের সাথে লাগানো।
- উস্তওয়ানা উফু্দ (প্রতিনিধি দলের খুঁটি): বাইরে থেকে আগত প্রতিনিধিদল এখানে বসে রাসূল (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করতেন এবং এখানে বসে কথা বলতেন। এটিও রওজা শরিফের পশ্চিম পাশে জালি মোবারকের সাথে লাগানো।
- উস্তওয়ানা মোহরেজ বা আলী (পাহারার খুঁটি): হিজরতের প্রথম অবস্থায় দুশমনের আক্রমণ থেকে রাসূল (সা.)-কে সাহাবায়ে কেরাম পালাক্রমে এখানে পাহারা দিতেন; কারো মতে হজরত আলী (রাঃ) এখানে পাহারা দিতেন। এ থেকেই এর নামকরণ হয়েছে।
- উস্তওয়ানা আয়েশা (আয়েশা খুঁটি): রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমার মসজিদে এমন একটি জায়গা আছে, মানুষ যদি সেখানে নামাজ পড়ার ফজিলত জানত, তাহলে সেখানে স্থান পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করত।’ রাসূল (সা.) ওফাতের পর হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁর ভাগ্নে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরকে (রাঃ) এই জায়গাটি চিনিয়ে দেন। এটি উস্তওয়ানা উফুদের পশ্চিমে রিয়াদুল জান্নাহর ভেতরে অবস্থিত।
- উস্তওয়ানা আবু লুবাবা (তওবার খুঁটি): হজরত আবু লুবাবা (রাঃ) একটি ভুল সংঘটিত হওয়ার পর নিজেকে এই খুঁটির সাথে বেঁধে বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত রাসূল (সা.) নিজে না খুলে দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এর সাথে বাঁধা থাকব।’ দীর্ঘ ৫০ দিন (মতান্তরে ৭ দিন) পর তাঁর তওবা কবুল হয় এবং রাসূল (সা.) নিজ হাতে তাঁর বাঁধন খুলে দেন। এটি উস্তওয়ানা উফুদের পশ্চিম পাশে রওজা শরিফের ভিতরে অবস্থিত।
রিয়াদুল জান্নাহর অন্যান্য বিশেষ স্থান
- মিহরাব ও মিম্বর: রাসূল (সা.) যে স্থানে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়াতেন, সেই মিহরাব এবং মিম্বর এখনো এই রিয়াদুল জান্নাহর ভেতরেই বিদ্যমান। উল্লেখ্য, এই মিম্বারের নিচেই হাউজে কাউসার অবস্থিত।
- হজরত বেলাল (রাঃ)-এর আজান দেওয়ার স্থান: এখানে হজরত বেলাল (রাঃ)-এর আজান দেওয়ার নির্দিষ্ট স্থানটিও রয়েছে।
আমাদের করণীয়
রিয়াদুল জান্নাহ ও এই পবিত্র খুঁটিগুলোর কাছে গেলে নফল নামাজ আদায়, বেশি বেশি দু‘আ, তওবা ও ইস্তেগফার করা এবং বিনম্র চিত্তে কান্নাকাটি করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করার চেষ্টা করা উচিত।